spot_img
Homeপূর্ব-পশ্চিমসিরিয়া ইস্যুতে বেপরোয়া ইসরায়েল, নেতানিয়াহুকে থামাবে কে?

সিরিয়া ইস্যুতে বেপরোয়া ইসরায়েল, নেতানিয়াহুকে থামাবে কে?

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইদলিবে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে সন্দেহভাজন ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এই সামরিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, সিরিয়া এবং ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে একটি ত্রিপক্ষীয় বিরোধ নিরসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক।

মার্কিন কূটনীতিকের পাশাপাশি নবগঠিত সিরীয় সরকারও সরাসরি এই আক্রমণের জন্য তেল আবিবকে দায়ী করে একে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক উসকানি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক মহলের মতে, ওয়াশিংটনের এই মধ্যস্থতার উদ্যোগ বাস্তবে সিরীয় ভূখণ্ডে সামরিক আগ্রাসন চালানো থেকে ইসরায়েলকে কতটা নিরস্ত করতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সিরিয়া রিপোর্ট-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সামি আকিলের মতে, সমস্যাটি কোনো দ্বিপাক্ষিক ভুল বোঝাবুঝি নয় বরং মাত্র একটি পক্ষ সামরিক হামলা চালিয়ে অঞ্চলটিকে ক্রমাগত অশান্ত রাখছে। ফলে সেখানে সাধারণ যোগাযোগের চ্যানেল তৈরি করে উসকানি থামানো কঠিন। সিরিয়ায় চার দশকের আসাদ সরকারের পতনের পর গঠিত নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিজেদের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের এই সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। কূটনীতিকদের মতে, দামেস্ক আলোচনার টেবিল খোলা রাখলেও তেল আবিব কূটনৈতিক সমাধানকে কোনো অগ্রাধিকার দিচ্ছে না, ফলে সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়া এখন এক প্রকার থমকে গেছে।

বাশার আল-আসাদের শাসনামলে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক নজর ছিল প্রধানত সিরিয়ায় থাকা ইরানি ও হিজবুল্লাহর ঘাঁটিগুলোর ওপর। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ইসরায়েলের সামরিক কৌশলে এক বড় ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরানি উপস্থিতির সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করার পাশাপাশি তেল আবিব এখন মনোযোগ ঘুরিয়েছে সিরিয়ায় ক্রমবর্ধমান তুর্কি আধিপত্যের দিকে। সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং আঙ্কারার মধ্যে শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্রতা গড়ে ওঠার বিষয়টিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করছে। আবু আল-দুহুর সামরিক ঘাটিতে সাম্প্রতিক হামলাটি মূলত আঙ্কারার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের একধরনের বার্তা বলেই ধারণা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

সামরিক আক্রমণের জন্য সরাসরি দায় স্বীকার না করলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা আলেপ্পোর কাছে ওই কৌশলগত বিমানঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের উদ্যোগকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বলে বিবেচনা করেছে। অন্যদিকে, তুর্কি পররাষ্ট্র ও তথ্য অধিদপ্তর ইসরায়েলি অভিযোগকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে। আঙ্কারার পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজেদের সম্প্রসারণবাদী ও আক্রমণাত্মক নীতি আড়াল করতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অবাস্তব সিকিউরিটি অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উত্তেজনার পেছনে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে।

চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো গালিব ডালাইসহ বহু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রয়োজন রয়েছে। ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন চাপের মুখে তেল আবিবকে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিতে হলেও সিরিয়া, লেবানন বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে অভ্যন্তরীণ ভোটারদের আকর্ষণ করতে চাচ্ছেন। ফলে এই অঞ্চলে প্রস্তাবিত কোনো নিরাপত্তা বা বিরোধ নিরসন কৌশল তখনই সফল হবে, যখন ওয়াশিংটন ইসরায়েল সরকারের ওপর সরাসরি ও জোরালো চাপ প্রয়োগ করবে। তা না হলে ভৌগোলিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের নীতি বা উদ্যোগ কোনো বাস্তব সুফল আনবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

- Advertisement -

spot_img
spot_img