spot_img
Homeপূর্ব-পশ্চিমট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে বিপাকে দক্ষিণ কোরিয়া, ৭২ বছরের সামরিক...

ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে বিপাকে দক্ষিণ কোরিয়া, ৭২ বছরের সামরিক মিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো আগাম বার্তা না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টের মাধ্যমে হঠাৎ করেই দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ৭২ বছরের সামরিক জোটে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ও সিউলের পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক বার্তার মাধ্যমে মহড়ার পরিধি ও সময়সীমা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এতে করে কোরীয় উপদ্বীপ জুড়ে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরির পাশাপাশি আমেরিকার দেওয়া যৌথ নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সিউলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ১১ দিনব্যাপী ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামের এই যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে ট্রাম্পের আকস্মিক নির্দেশে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আসার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্সেস কোরিয়ার কমান্ডার জেনারেল জেভিয়ার ব্রানসন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বেক দ্রুত জরুরি বৈঠকে বসেন। সমঝোতা অনুযায়ী, নির্ধারিত ১১ দিনের স্থলে মহড়া কমিয়ে পাঁচ দিনে নিয়ে আসা হয়েছে এবং ফিল্ড ট্রেনিং ও কৌশলগত অনুশীলনের বড় একটি অংশও বাতিল কিংবা সিমুলেশনে রূপান্তর করা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, এ ধরনের যৌথ মহড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছে এক ধরনের উসকানিমূলক বার্তা পাঠায় এবং এটি অযথা খরচ বৃদ্ধি করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নির্দেশের পেছনে শুধু উত্তর কোরিয়ার প্রতি নমনীয় হওয়ার ইচ্ছাই কাজ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে আমেরিকার শুরু করা যুদ্ধও বড় ভূমিকা রেখেছে। ওভাল অফিসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ হাজার সেনা দক্ষিণ কোরিয়াকে কিম জং উনের সম্ভাব্য আগ্রাসন থেকে রক্ষা করছে, সেখানে ইরান অভিযানে ওয়াশিংটনকে সরাসরি সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিউল। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাসের ছবি ফুটিয়ে তুলেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। দেশটির পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন স্বীকার করেন যে, ট্রাম্পের এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঘোষণার বিষয়ে তাঁদের আগে কোনো ধারণা বা আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম শীর্ষ দৈনিক ‘হানকুক ইলবো’ এক সম্পাদকীয়তে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে লিখেছে, যুক্তরাষ্টের এমন একক মনোভাবের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন বাস্তব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ওয়াশিংটন তার পুরোনো মিত্রকে পাশে না পেয়ে ক্ষুব্ধ, সেখানে উত্তর কোরিয়াকে ট্রাম্প আরও বেশি সমীহ প্রদর্শন করছেন। অন্যদিকে অন্যান্য রক্ষণশীল সংবাদপত্রগুলো সতর্ক করেছে যে, আমেরিকা মিত্রতার চেয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এশিয়ায় শক্তি ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং উদ্ভূত রাজনৈতিক উত্তেজনায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় তিনি একদিকে যেমন দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেন, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি কৌশলগত নমনীয়তা দেখিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে কোরিয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ওরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় ওয়াশিংটনকে সহায়তার ইঙ্গিত প্রদান করেন।

তবে বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নীতি-নির্ধারকদের মতে, ১৯৭০ এর দশকের পর মার্কিন সামরিক ছায়াতলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আগে কখনও দেখা দেয়নি। ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ও অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তের কারণে সিউলে নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠতে পারে। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার ভাবা দক্ষিণ কোরিয়া এখন বুঝতে পারছে, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ নীতি ও একক স্বার্থের কারণে যেকোনো সময় যৌথ প্রতিরক্ষার শর্ত বদলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এক বার্তা ঘিরে এখন পুরো এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে।

- Advertisement -

spot_img
spot_img