বাস ট্রেন লঞ্চে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে

ঈদ উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি শুরু আজ মঙ্গলবার। সোমবার ছিল সরকারি দপ্তরের শেষ কর্মদিবস। এদিন বিকালের পর থেকেই রাজধানীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে ঈদের ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে টার্মিনালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বাড়তি যাত্রী পরিবহণে গণপরিবহণগুলোতে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া ছিল। মোতায়েন ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সদস্যও। সড়ক, রেল এবং নৌমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী টার্মিনাল পরিদর্শন করেছেন। এসব কারণে যাত্রীদের উল্লেখযোগ্য ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে অনেক বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার বাসের বাড়তি ট্রিপ ঢাকা ছেড়ে গেছে। বেশির ভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়েছে। তবে কিছু ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পর ছেড়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি লঞ্চ বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর উদ্দেশে যাত্রী নিয়ে গেছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) থেকে ৫৪টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। আজ থেকে লঞ্চের স্পেশাল ট্রিপ শুরু হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা (ব্রিজের নিচের) টার্মিনাল থেকে ৬টি এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে তিনটি লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাবে। ঈদ উপলক্ষ্যে এ দুটি ঘাট নতুন নির্মাণ করা হয়েছে। তারা আরও জানান, গার্মেন্টসহ শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার পর মানুষের চাপ আরও বাড়বে।

সরেজমিন যাত্রাবাড়ী ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কেউ সিএনজিতে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ নগর পরিবহণের বাসে করে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে আসছেন। তবে বাড়ি যাওয়ার আনন্দে বাস টার্মিনালে এসে নিমিষেই যেন চোখে-মুখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন পরিবহণের ভাড়ার কথা শুনে। আগে যেখানে ভাড়া ছিল ২২০ টাকা, সেখানে এখন ৩শ টাকা নেওয়া হচ্ছে। একটি পরিবারের ৫ জন সদস্য থাকলে সেখানে তাদের বাস ভাড়াই গুনতে হচ্ছে ১৫শ টাকা।

লাকসামগামী মনির হোসেন জানান, তিশা পরিবহণের বাসে আগে ২০০ টাকা নেওয়া হলেও তিনি ৩শ টাকায় টিকিট নিতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকা-কচুয়া রুটের সুরমা পরিবহণের যাত্রী মোসলেহ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আগে কচুয়ার ভাড়া নিত ২২০ টাকা। এখন নেয় ২৫০ টাকা। এভাবে প্রতিটি পরিবহণ থেকেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিশা পরিবহণের সুপারভাইজার পলাশ বলেন, সরকার নির্ধারিত হার অনুযায়ী ভাড়া নিচ্ছি।

ঢাকা-মাওয়া সড়কের যাত্রাবাড়ী বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ায় নৈরাজ্য ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা-বরিশাল রুটের শ্যামলী পরিবহণের ভুক্তভোগী যাত্রী মো. হাসান যুগান্তরকে বলেন, আগে বরিশাল যেতাম ৫৫০ টাকায়। এখন নিচ্ছে ৭৫০ টাকা।

এদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগে রাজিব পরিবহণ, বনফুল বাস, ইউনিক পরিবহণ, গোল্ডেন লাইন বাস, আইকনিক বাস, হিমাচল বাসকে ১৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন মোবাইলকোর্ট। সোমবার স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শরিফুর রহমান এ মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করেন। এছাড়া সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় কাউন্টারে বিআরটি’র নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা না রাখার কারণে ২টি বাস কাউন্টারের ম্যানেজারকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ট্রাফিক ওয়ারী বিভাগের ডিসি মো. আজাদ রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সরেজমিন গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে যাত্রীর চাপ দেখা গেছে। ছিল বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও। টার্মিনালের প্রবেশমুখে বড় আকারের ভাড়ার চার্ট টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে গাবতলী সড়কের যানজট নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। টার্মিনালের মাইকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে অভিযোগ করতে আহ্বান জানানো হয়। তবুও নানা কৌশলে যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যশোরের যাত্রী নিলয় আলমগীর অভিযোগ করেন, ঈগল পরিবহণের বাসে যশোরের গন্তব্য বলা হলেও খুলনার টিকিট নিতে বাধ্য করেছে। এজন্য বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে। জানতে চাইলে গাবতলীর ঈগল পরিবহণের কর্মচারী আবদুল রব বলেন, কেউ যদি যশোর নেমে পড়ে তাকে খুলনার ভাড়াই দিতে হবে। আমরা তো তার কাছে যশোরের টিকিট বিক্রি করি না, খুলনার টিকিট বিক্রি করি।

ট্রেন : সরেজমিন দেখা গেছে, স্টেশনে ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড় থাকলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেলেও কোথাও তেমন বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত চাপ নেই। অনেক ট্রেন দেরিতে ছাড়লেও যাত্রীরা স্বস্তির সঙ্গেই ট্রেনে উঠছেন। স্টেশনের বিভিন্ন পয়েন্টে নিরাপত্তা সদস্যদের তৎপরতা দেখা গেছে।

স্টেশনের ট্রেন ট্র্যাকিং সহায়তা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন নির্ধারিত সময়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যেতে না পারায় সিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে বনলতা এক্সপ্রেস ৩২ মিনিট, প্রবাল এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ১৯ মিনিট, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা, বিজয় এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট, রুপসা এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২৪ মিনিট, রংপুর এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২৭ মিনিট, চিত্রা এক্সপ্রেস ২২ মিনিট, মহানগর প্রভাতী ২ ঘণ্টা ১৪ মিনিট এবং লালমনি এক্সপ্রেস ১৮ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে। এছাড়া রাজশাহী সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ১৭ মিনিট এবং সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৫১ মিনিট বিলম্বে ছাড়ে। তবে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও সুবর্ণা এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়েই ছেড়েছে।

নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসও অন্তত ১ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়বে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস অন্তত সাড়ে ৩ ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে বলে জানা গেছে। স্টেশনে অপেক্ষারত উপকূল এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. ইমন বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ আমরা পাঁচজন বাড়ি যাচ্ছি। বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে ট্রেন ছাড়ার কথা থাকলেও এখনো ছাড়েনি। কর্তৃপক্ষ বলছে অন্তত ১ ঘণ্টা দেরি হবে। একই ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছেন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফাহমিদা আক্তার। তিনি জানান, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য স্টেশনে এসেছেন, তবে ট্রেনটি প্রায় ১ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়বে বলে জানানো হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, এবারের ঈদযাত্রায় শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হয়েছে। এতে টিকিটের কালোবাজারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাশাপাশি ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার জন্য অগ্রিম টিকিট বিক্রিও শুরু হয়েছে।

কমলাপুর স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, এবার শতভাগ অনলাইনে টিকিট দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি ১০০টি আসনের বিপরীতে ২৫ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারবেন। বিভিন্ন রুটের ট্রেন মাঝপথে কয়েকটি স্টেশনে থামে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের কারণে কখনো কখনো দেরি হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করছি ট্রেনগুলো সঠিক সময়ে ছাড়তে এবং যাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা দিতে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট সরকার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শুরু থেকেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তিনি জানান, ঢাকা স্টেশন এলাকায় মোট ২৭টি পয়েন্টে এক্সেস কন্ট্রোল করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ স্টেশনগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিছু প্রতারণা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

লঞ্চ : সোমবার সরেজমিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে পন্টুন সংস্কার ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জরুরি সেবার হেল্পলাইন নম্বর টানানো হয়েছে। কোন ঘাট থেকে কোন এলাকার লঞ্চ ছাড়বে সে সম্পর্কেও নির্দেশনা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। দিনভর যাত্রীদের উপস্থিতি না থাকলেও বিকাল ও সন্ধ্যার দিকে ভিড় বাড়তে দেখা যায়। নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করছেন মালিকপক্ষের কর্মীরা। যাত্রী ডাকাডাকিও চলতে দেখা যায় বিভিন্ন পন্টুনে।

সদরঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ কমাতে এবং যাতায়াত সহজ করতে এ বছর ঈদযাত্রায় দুটি বিকল্প ঘাট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বছিলা ব্রিজসংলগ্ন লঞ্চঘাট এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু থাকবে।

বরিশালগামী যাত্রী মো. জাকির হোসেন মিলন বলেন, ঈদের সময় ঘাটে অনেক ভিড় থাকে। তখন বয়স্ক মানুষ ও বেশি মালামাল নিয়ে চলাচল করা বেশ কষ্টকর হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ যদি বিনামূল্যে কুলি ও হুইলচেয়ার সেবা দেয়, তাহলে যাত্রীদের জন্য এটি খুবই সহায়ক হবে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে বলে তিনি মনে করেন।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর টার্মিনাল পরিদর্শন : সোমবার মহাখালী টার্মিনাল পরিদর্শন করেন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ওই টার্মিনালে তিনি বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। একই দিন বিকালে সদরঘাট পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নৌ-প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। এ সময় যাত্রীদের উন্নত সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে টার্মিনালে ট্রলি ও হুইলচেয়ার সার্ভিস উদ্বোধন করেন মন্ত্রী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles